গণতন্ত্রের পরীক্ষা: ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন—প্রস্তুতি না অশুভ সংকেত?
আওরঙ্গজেব কামাল : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬—এই একটি তারিখ ঘিরেই আজ দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন উত্তপ্ত। গ্রামের চায়ের দোকান থেকে শহরের বৈঠকখানা—সর্বত্র এক প্রশ্নই ঘুরে ফিরে আসছে নির্বাচন আদৌ হবে তো? নাকি অশুভ কোনো সংকেত অপেক্ষা করছে সামনে? যদিও নির্বাচন কমিশন বারবার দাবি করছে, সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন, তবুও বাস্তবতার মাটিতে দাঁড়িয়ে জনমনে সংশয় কাটছে না। গণতন্ত্র কেবল একটি সাংবিধানিক শব্দ নয়—এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া, যার প্রধানতম প্রকাশ নির্বাচন। এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সেই অর্থে ব্যতিক্রমী ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এই নির্বাচনের মধ্য দিয়েই একদিকে জাতীয় সংসদ গঠিত হবে, অন্যদিকে অনুষ্ঠিত হবে একটি গণভোট। সরকারের ভাষ্যমতে, এই দিন ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশে গণতন্ত্রের নতুন এক রূপদান করা হবে। সরকারি প্রচারণায় স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হচ্ছে—দলীয় ভোট যেদিকেই যাক, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটই হওয়া উচিত। সরকারের যুক্তি, ‘না’ ভোট জয়ী হলে স্বৈরাচার ও পুরোনো জটিলতা আবার ফিরে আসতে পারে। তবে এর বিপরীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি শক্তিশালী প্রচার চলছে—১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন আদৌ অনুষ্ঠিত হবে না। এই প্রচারণা জনমনে নতুন করে সন্দেহ ও বিভ্রান্তি তৈরি করছে। এই প্রেক্ষাপটে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. মাহমুদুল হাসান একটি রিট আবেদন করে নির্বাচন স্থগিতের নির্দেশনা চেয়েছেন। তার আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় দেশের বিভিন্ন থানা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যালয় থেকে লুট হওয়া ৫ হাজার ৭৫০টি আগ্নেয়াস্ত্র এবং ৬ লাখ ৫১ হাজার ৬০৯ রাউন্ড গোলাবারুদের একটি বড় অংশ এখনো উদ্ধার হয়নি। উদ্বেগজনক হলো, সরকার পুরস্কার ঘোষণা করেও এসব অস্ত্র পুরোপুরি উদ্ধার করতে পারেনি। ঢাকা-৮ আসনের সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী শরীফ উসমান হাদির সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হওয়ার ঘটনা এই আশঙ্কাকে আরও জোরালো করেছে—অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার না হলে নির্বাচন রক্তক্ষয়ী হয়ে উঠতে পারে। নির্বাচন কমিশন প্রশাসনিক প্রস্তুতির কথা বললেও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা এখনো পুরোপুরি স্বস্তিদায়ক নয়। ভোটার তালিকা হালনাগাদ, কেন্দ্রভিত্তিক অবকাঠামো, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরপেক্ষতা এবং আচরণবিধি কার্যকর করার সক্ষমতা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের নিরপক্ষতা নিয়ে অনেক রাজনৈতিক দলের নেতারা প্রশ্ন তুলেছেন। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ রাজনৈতিক অংশ গ্রহণের পরিবেশ। গণতন্ত্রের মৌলিক শর্ত হলো সকল রাজনৈতিক দলের অবাধ ও নির্ভীক অংশগ্রহণ। অথচ পারস্পরিক অনাস্থা, অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ এবং সংলাপের অভাব এখনো প্রকট। বিরোধী দলগুলোর আশঙ্কা যদি দূর না হয়, তবে একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠবে—যা গণতন্ত্রের জন্য মোটেও শুভ বার্তা নয়। এই অবস্থায় নির্বাচন স্থগিতের রিট কেবল একটি আইনি প্রক্রিয়া নয়; এটি রাষ্ট্রীয় প্রস্তুতি ও রাজনৈতিক আস্থার ঘাটতির প্রতিফলন। আদালত যদি মনে করে নির্বাচনকালীন পরিবেশ সাংবিধানিক মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থ, তবে স্থগিতাদেশ গণতান্ত্রিক স্বার্থ রক্ষার অংশ হিসেবেই বিবেচিত হতে পারে। তবে অনির্দিষ্টকালের স্থগিতাদেশও গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ—এ কথাও অস্বীকার করা যায় না। এদিকে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে দৃঢ় অবস্থান জানানো হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেছেন,“কে কী বললো তাতে কিছু আসে-যায় না। ১২ ফেব্রুয়ারিতেই নির্বাচন হবে—একদিন আগেও না, একদিন পরেও না।”একই সুরে প্রধান উপদেষ্টার উপ-প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার জানিয়েছেন, প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বিদেশি প্রতিনিধিদের আশ্বস্ত করেছেন যে আসন্ন নির্বাচন হবে স্বাধীন, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ। নির্বাচনকালীন সরকার সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থাকবে এবং সব রাজনৈতিক দলের জন্য সমান সুযোগ বা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করা হবে। এবারের নির্বাচনে ৫১টি রাজনৈতিক দল অংশ নিচ্ছে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না। ফলে তাদের ভোটব্যাংক দখলের প্রতিযোগিতায় অন্য দলগুলো মাঠে নেমেছে। প্রশ্ন হলো—কে কতটা সুবিধা আদায় করতে পারবে? আজকের যুগে গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় হুমকি আর শুধু ব্যালট বাক্স ছিনতাই বা সাঁজোয়া গাড়ির উপস্থিতি নয়। এটি নীরবে ঢুকে পড়ছে স্মার্টফোনের পর্দায়—এআই-তৈরি ভিডিও, ভুয়া ঘোষণা ও বিভ্রান্তিকর কনটেন্টের মাধ্যমে। ভোটের আগের রাতেই কোনো প্রার্থী নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন—এমন ভুয়া খবর ছড়িয়ে পড়া নিছক গুজব নয়; এটি সংগঠিত ডিজিটাল আক্রমণ। ফলে ‘দেখা মানেই বিশ্বাস’—এই ধারণা ভেঙে দিতে হবে নির্বাচন কমিশনকে । এই বাস্তবতায় নির্বাচন কমিশনের সতর্কতা অত্যন্ত জরুরি। ইতিমধ্যে ইসি নির্দেশ দিয়েছে—যারা নির্বাচনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে, তাদের তালিকা তৈরি করে নজরদারিতে রাখতে হবে। পুলিশ মহাপরিদর্শক বাহারুল আলম জানিয়েছেন, নির্বাচনের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে জড়িতদের বিরুদ্ধে গত ছয় মাস ধরেই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং তা অব্যাহত থাকবে। সব মিলিয়ে মাঠে নির্বাচনী পরিবেশ দৃশ্যমান। প্রার্থীরা ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন। তবুও প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে—তাহলে কেন এত সন্দেহ, কেন এত আশঙ্কা?
আমার বিশ্বাস, ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর নির্বাচন কেবল একটি ভোটের দিন নয়—এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার এক কঠিন পরীক্ষা। প্রস্তুতির ঘাটতি থাকলে তা সংশোধন করতে হবে, আর আস্থার সংকট থাকলে তা দূর করতে হবে সংলাপ ও সহনশীলতার মাধ্যমে। গণতন্ত্র রক্ষার স্বার্থে দ্রুততার চেয়ে গ্রহণযোগ্যতাই হওয়া উচিত সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
লেখক ও গবেষকঃ
আওরঙ্গজেব কামাল
সভাপতি
ঢাকা প্রেস ক্লাব
ও আন্তর্জাতিক প্রেস ক্লাব

