আওরঙ্গজেব কামালঃ সাংবাদিকতা এক সময় ছিল সমাজ বদলের একটি মহৎ হাতিয়ার। কলম ছিল প্রতিবাদের সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র। সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো মানেই ছিল সাংবাদিকতা — ভয়ডরহীন, অনুসন্ধানী ও দায়িত্বশীল। কিন্তু সময়ের বাস্তবতা এখন ভিন্ন। আজ আমরা যেন এক ভয়াবহ ট্র্যাজেডির মঞ্চে দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে কলমের কালি মুছে গিয়ে জায়গা করে নিয়েছে ইউটিউব সাবস্ক্রাইবার, ফেসবুক সাংবাদিকতা। সাংবাদিকদের হাত ধরেই তৈরি হয় সংবাদপত্র, যা সমাজের দর্পণ। রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে গণমাধ্যম জাতির পথনির্দেশক হিসেবে কাজ করে। কিন্তু আজ এই সাংবাদিক সমাজ দ্বিধাবিভক্ত। অপসাংবাদিকদের ভিড়ে পেশাদার সাংবাদিকদের মর্যাদা মাটিতে মিশে গেছে। সাংবাদিকতার জগতে অপরাধীদের অনুপ্রবেশ এর মুল কারন । বর্তমানে এমন এক অবস্থা তৈরি হয়েছে যেখানে অপরাধীরাও সাংবাদিকের খোলসে ঢুকে পড়েছে। প্রশ্ন উঠছে—একজন অপরাধী কীভাবে রিপোর্টার হয়ে যাচ্ছেন ? একজন চাঁদাবাজ রাতারাতি ‘ইনভেস্টিগেটিভ রিপোর্টার’ হয়ে কীভাবে থানায় প্রবেশাধিকার পান? অনেক মিডিয়া মালিকই এসব জানেন, দেখেন, তবু চুপ থাকেন। কারণ, তারাও এসব অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অংশীদার। আর প্রকৃত সাংবাদিকরা? যাঁরা সম্মান নিয়ে বাঁচতে চান, তাঁদের নেই চাকরি, নেই সম্মান, নেই উপযুক্ত বেতন। বরং এসব ভুয়া সাংবাদিকদের কারণে তাঁদের হতে হয় নানা রকম সন্দেহ ও প্রশ্নের সম্মুখীন। বর্তমানে সাংবাদিকতা নয়, এখন যেন ব্যবসায় পরিনত হয়েছেন। আজকের তথাকথিত সাংবাদিকতার বড় অংশ জুড়ে রয়েছে অসুস্থ ব্যবসার ছাপ। অশিক্ষিত ও কুশিক্ষিত একটি চক্র অর্থের বিনিময়ে নামসর্বস্ব আন্ডারগ্রাউন্ড পত্রিকার ‘প্রেস কার্ড’ সংগ্রহ করে সাংবাদিক পরিচয়ে সাধারণ মানুষকে ভয় দেখিয়ে প্রতারণা করছে। এ থেকে প্রকৃত সাংবাদিকরাও রেহায় পাচ্ছেন না।এই ভূয়া সাংবাদিকদের দৌরাত্ম্য দিনে দিনে বেড়েই চলেছে। তাদের ফাঁদে পড়ে হয়রানির শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ, সরকারি ও বেসরকারি কর্মকর্তা, এমনকি জনপ্রতিনিধিরাও। অভিযোগ ও প্রতারণার পদ্ধতির বিষয়ে জানাযায়, ফেসবুকে বিগত সরকারের মন্ত্রী এমপিদের অনুষ্টানের ছবি এ আই ব্যবহার করে প্রকৃত সাংবাদিকদের হয়রাণী করছে। এই চক্রটি কয়েকটি ভূয়া ফেসবুক তৈরী করে এ ধরনের তথ্য সন্ত্রাস করছে।
অনেকেই অভিযোগ করেছেন, এরা সাংবাদিক পরিচয়ে সংবাদ প্রকাশের ভয় দেখিয়ে চাঁদা দাবি করছে। আবার কেউ কেউ ‘প্রেস’ লেখা মোটরসাইকেল ব্যবহার করে মাদক ব্যবসা, দালালি, চাঁদাবাজিসহ নানা অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। একটি চক্র দলবদ্ধভাবে সাংবাদিক পরিচয়ে গ্যাং তৈরি করে মানুষের কাছ থেকে অর্থ আদায় করছে এবং প্রতিষ্ঠানে গিয়ে ক্ষমতার দাপট দেখাচ্ছে। এতে বিভ্রান্ত হচ্ছেন প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতা, ব্যবসায়ী এবং সাধারণ মানুষ।স্থানীয় সাংবাদিকদের মতে, ভুয়া সাংবাদিকদের একটি অংশ পেশাদারদের লেখা সংবাদ কপি করে নিজেদের নামে অনলাইনে প্রচার করছে। অনেক সময় মোবাইল ফোনে হুমকি, চাঁদাবাজি ও অবৈধ ব্যবসার সঙ্গেও জড়িত তারা। যে কারনে প্রকৃত সাংবাদিকদের সংকট দেখাদিয়েছে। জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের মত, প্রকৃত সাংবাদিকদের মধ্যে ঐক্যের অভাব থাকায় এই সমস্যা বেড়ে চলেছে। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে রাজনীতিবিদরা দলীয় লোকদের সাংবাদিক বানিয়ে পেশাদারদের বিপাকে ফেলাচ্ছেন। অপপ্রচারের মাধ্যম হিসেবে সোশ্যাল মিডিয়া ফেসবুকে এই অপপ্রচার বেশী হচ্ছে। এক্ষেত্রে ‘সৈরাচারমুক্ত সুবিদাবাদ বিরোধী এক্সপ্রেস’ নামের একটি ফেসবুক পেজের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, যারা নিয়মিতভাবে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। এমনকি ছবি সরানোর জন্য চাঁদা দাবি করার ঘটনাও ঘটেছে। এই পেজ থেকে আওয়ামী লীগ বিরোধী সাংবাদিকদেরকেও হেয় করা হচ্ছে। বিএনপি বা অন্যান্য রাজনৈতিক মতাদর্শের সাংবাদিকদেরকে সরকারঘেঁষা হিসেবে প্রমাণ করার চেষ্টা চলছে। যে সব সাংবাদিকরা বিগত সরকারের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রচার করে অপদস্ত হয়েছেন তাদের কেও এই মিথ্যা ফেসবুক সন্ত্রাসীরা হয়রানী করছে এবং আওয়ামীলীগের টারগের্ট বাস্তবায়ন করছে। অনেক সাংবাদিককে সত্য বলার মূল্য দিতে হচ্ছে। এমকি জীবন দিতে হয়েছে। এমন এক সময়ে, যখন সাংবাদিকদের উচিত দুর্নীতি উন্মোচন করা, তখন তারাই হয়ে পড়ছেন হুমকির শিকার। পদে পদে বাধা দেওয়া হচ্ছে, প্রাণনাশের হুমকি পাচ্ছেন সাহসী সাংবাদিকরা। সত্য প্রকাশের চেষ্টায় তাঁদের বিরুদ্ধে চালানো হচ্ছে অপপ্রচার, হয়রানি এবং কখনো কখনো সহিংসতা। সাংবাদিকতা এখন এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। অপসাংবাদিকতার ছোবল পেশাদার সাংবাদিকতাকে হুমকির মুখে ফেলেছে। এই অবস্থার অবসানে একান্ত প্রয়োজন বলে মনে করেছেন অভিজ্ঞজনেরা। এ জন্য একটি কঠোর নীতিমালার একান্ত প্রয়োজন। এছাড়া ভুয়া সাংবাদিকদের শনাক্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা,মিডিয়া মালিকদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং পেশাদার সাংবাদিকদের মধ্যে ঐক্য গড়ে তোলা। সাংবাদিকতা যেন আবার সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে — সেই প্রত্যাশায়।

