ডেস্ক রিপোর্ট : ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে লাখো মানুষের ঢল নেমেছে। ইরাকের পপুলার মবিলাইজেশন ফোর্সেস (পিএমএফ) বা হাশদ আল-শাবি জানিয়েছে, পবিত্র শহর নাজাফে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির শোক মিছিলে ২৩ লাখেরও বেশি মানুষ অংশ নিয়েছেন। রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠানের অংশ হিসেবে বুধবার তার মরদেহ ইরাকের পবিত্র নগরী নাজাফে নেওয়া হলে বিপুলসংখ্যক মানুষ শোকযাত্রায় অংশ নেন। আনুষ্ঠানিকতা শেষে মরদেহ কারবালায় নেওয়া হয়। সেখান থেকে মরদেহ ইরানে ফিরিয়ে আনা হয়। ইরান ও ইরাকের পাঁচটি শহরে বিরাট শোকানুষ্ঠানের পর বৃহস্পতিবার জন্মশহর মাশহাদে দাফন করা হবে খামেনিকে। এর আগে মিছিলটি মাজার থেকে কুফা সেতু এবং থাওরাত আল-আশরিন চৌরাস্তা হয়ে আল-সদরিন স্কয়ারের দিকে অগ্রসর হয়। এরপর খামেনির লাশবাহী কারবালার দিকে নিয়ে যাওয়া হয়।গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধ শুরুর দিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় পরিবারের চার সদস্যসহ খামেনি নিহত হন। এর পরপরই তার দাফন হওয়ার কথা ছিল। তবে যুদ্ধের তীব্রতার কারণে তারিখ পেছানো হয়।সর্বশেষ যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে সমঝোতা স্মারক সইয়ের পর খামেনিকে দাফন করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয় ইরান সরকার।সে অনুযায়ী গত শুক্রবার থেকে খামেনির দাফন ঘিরে শুরু হয় সপ্তাহব্যাপী শোক অনুষ্ঠান। শুক্র, শনি ও রোববার খামেনির কফিন রাখা হয় তেহরানের প্রধান মসজিদ গ্র্যান্ড মোসাল্লায়। সোমবার মরদেহ নেওয়া হয় ইরানের কোম শহরে। সেখান থেকে উড়োজাহাজে করে মরদেহ পৌঁছায় প্রতিবেশী দেশ ইরাকে। বুধবার ভোর থেকে কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে ইরাকের নাজাফে শোকযাত্রা শুরু হয়। ইরানের জাতীয় পতাকায় মোড়ানো কফিনটি একটি বিশেষ কাচের কফিনবাহী যান দিয়ে বহন করা হয়। নাজাফে হজরত আলী (রা.)-এর পবিত্র মাজারে তার রূহের
মাগফিরাত কামনায় দোয়া অনুষ্ঠিত হয়। এরপর মরদেহ কারবালার উদ্দেশে নেওয়া হয়, যেখানে ইমাম হুসাইন (রা.) ও হজরত আব্বাস (রা.)-এর পবিত্র মাজারেও শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। ইরাকে আয়োজিত শোকযাত্রায় অংশ নেওয়া মানুষের হাতে ছিল ইরানের জাতীয় পতাকা, কালো শোকপতাকা এবং প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত লাল পতাকা। অনেককে বুক চাপড়ে শোক প্রকাশ করতে দেখা যায়। নাজাফ ও কারবালার বিভিন্ন সড়কে শোকযাত্রীদের জন্য স্বেচ্ছাসেবীরা বিনা মূল্যে খাবার ও পানীয় বিতরণ করেন।নাজাফ শিয়া মুসলিমদের অন্যতম পবিত্র নগরী। ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে অসংখ্য শিয়া আলেম ও ধর্মীয় নেতা সেখানে শিক্ষা গ্রহণ ও শিক্ষা দিয়েছেন। তাদের মধ্যে ইরানের ইসলামি বিপ্লবের নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনিও রয়েছেন। প্রতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে লাখো শিয়া মুসলিম নাজাফ ও কারবালা জিয়ারত করতে যান।বিশ্লেষকদের মতে, ইরাকে লাখো মানুষের অংশগ্রহণে আয়োজিত এই শোকযাত্রা শুধু ধর্মীয় আবেগের বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং ইরান-ইরাকের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক ও আধ্যাত্মিক সম্পর্কেরও প্রতীক। ২০০৩ সালে সাদ্দাম হুসেইনের পতনের পর দুই দেশের সম্পর্ক নতুন মাত্রা পায়, যার প্রতিফলন খামেনির শেষ বিদায়ের এই আয়োজনেও দেখা গেছে।এদিকে এমন এক সময় খামেনির রাষ্ট্রীয় শেষকৃত্যের আয়োজন করা হচ্ছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে সামরিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সাম্প্রতিক হামলা-পাল্টা হামলার মধ্যেই শোকানুষ্ঠান চলছে। ইরানি কর্মকর্তাদের আশা, বিপুল জনসমাগম দেশের জাতীয় ঐক্য ও প্রতিরোধের বার্তা বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরবে।এদিকে নিরাপত্তাজনিত কারণে খামেনির উত্তরসূরি হিসেবে নির্বাচিত তার দ্বিতীয় ছেলে মোজতবা খামেনি এখনো জনসমক্ষে আসেননি। তবে ইরানি গণমাধ্যমের দাবি, তিনি লিখিত বার্তার মাধ্যমে দায়িত্ব পালন করছেন।

