বিশেষ প্রতিনিধি : “স্বাধীন ও বহুমাত্রিক মত প্রকাশের স্বাধীনতাই গণতন্ত্র” এই শ্লোগানকে হৃদয়ে ধারণ করে বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস উপলক্ষে রাজধানী ঢাকার জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে অনুষ্ঠিত হয়েছে ফেডারেশন অব বাংলাদেশ জার্নালিস্ট অর্গানাইজেশন (এফবিজেও)-এর উদ্যোগে এক বিশাল মানববন্ধন, বিক্ষোভ সমাবেশ ও প্রতিবাদ কর্মসূচি।রোববার (৩ মে) সকাল ১০টায় আয়োজিত এ কর্মসূচিতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত প্রায় ৩০টি সাংবাদিক, গণমাধ্যম, সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ অংশগ্রহণ করেন। জাতীয় প্রেসক্লাব প্রাঙ্গণ পরিণত হয় সাংবাদিক সমাজের অধিকার, মর্যাদা ও স্বাধীনতার দাবিতে এক মিলনমেলায়। ব্যানার, ফেস্টুন, প্ল্যাকার্ড এবং প্রতিবাদী স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন এফবিজেও’র প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান এবং ‘অপরাধ বিচিত্রা’র সম্পাদক আলহাজ্ব এস এম মোরশেদ। সভাপতির বক্তব্যে আলহাজ্ব এস এম মোরশেদ বলেন,“গণমাধ্যম রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ। একটি রাষ্ট্রে বিচার, প্রশাসন ও আইন যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গণমাধ্যম সত্য প্রকাশের মাধ্যমে রাষ্ট্রকে জবাবদিহিতার মধ্যে রাখে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে আজও দেশের সাংবাদিকসমাজ নানা নির্যাতন, হয়রানি, নিরাপত্তাহীনতা ও আর্থিক বৈষম্যের শিকার। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত না হলে গণতন্ত্রও নিরাপদ থাকবে না।তিনি আরও বলেন,
“বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস শুধু একটি আন্তর্জাতিক দিবস নয়, এটি সত্য, ন্যায়, মানবাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রতীক। তাই বাংলাদেশেও দিবসটি রাষ্ট্রীয়ভাবে পালনের উদ্যোগ নিতে হবে এবং সাংবাদিকদের পেশাগত মর্যাদা রক্ষায় কার্যকর আইন বাস্তবায়ন করতে হবে।”সমাবেশে বক্তব্য রাখেন এফবিজেও’র মহাসচিব এস. এম. হানিফ আলী, ঢাকা প্রেস ক্লাব ও আন্তর্জাতিক প্রেস ক্লাবের সভাপতি আওরঙ্গজেব কামাল, বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরাম (বিএমএসএফ)-এর প্রতিষ্ঠাতা ও ট্রাস্টি বোর্ড চেয়ারম্যান আহমেদ আবু জাফর, মিডিয়া ওয়ার্ল্ড ক্লাবের সভাপতি আলতাফ হোসেন মোল্লা, সাধারণ সম্পাদক মো. দেলোয়ার হোসেন, স্বদেশ বিচিত্রার সম্পাদক আশোক ধর, সাংবাদিক নেতা লায়ন ইব্রাহিম ভূঁইয়া, মো. শাহিন আলম, মো. ইদি আমিন এপোলো, মো. ফারুক হোসেন, মো. কামরুজ্জামান, মো. আবুল কালাম, মো. ফজলুর রহমান, মো. আজার আলী, মোসাম্মৎ মাহফুজা আক্তার মলি, মো. সানজিদসহ প্রিন্ট, টেলিভিশন, অনলাইন ও তৃণমূল পর্যায়ের অসংখ্য সাংবাদিক নেতা। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সংগঠনের ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক কে. এম. মাসুদুন্নবী নুহু।বক্তারা বলেন, দেশের সাংবাদিক সমাজ আজ নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। সত্য প্রকাশ করতে গিয়ে সাংবাদিকদের হামলা, মামলা, হুমকি, চাকরিচ্যুতি, আর্থিক সংকট ও সামাজিক হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটছে। তাই সাংবাদিক সুরক্ষা আইন, পেনশন সুবিধা, স্বাস্থ্য নিরাপত্তা, ন্যায্য বেতন কাঠামো এবং স্বাধীনভাবে সংবাদ প্রকাশের পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।
ঢাকা প্রেস ক্লাব ও আন্তর্জাতিক প্রেস ক্লাবের সভাপতি আওরঙ্গজেব কামাল বলেন,“সাংবাদিকদের কণ্ঠরোধ মানে জনগণের কণ্ঠরোধ। কারণ গণমাধ্যম জনগণের কথা বলে, সত্য তুলে ধরে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। তাই সাংবাদিক সমাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব।”
সমাবেশে বক্তারা বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস উপলক্ষে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি তুলে ধরেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য
১. প্রতি বছর ৩ মে বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস রাষ্ট্রীয়ভাবে তথ্য মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে পালন করতে হবে।
২. ১৪ ফেব্রুয়ারি প্রেস কাউন্সিল দিবসকে জাতীয়ভাবে স্বীকৃতি দিয়ে সরকারি কর্মসূচির আওতায় আনতে হবে।
৩. ফেডারেশন অব বাংলাদেশ জার্নালিস্ট অর্গানাইজেশনকে তথ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে আনুষ্ঠানিক নিবন্ধন প্রদান করতে হবে।
৪. দেশের সকল সাংবাদিক ও সাংবাদিক সংগঠনকে প্রেস কাউন্সিলের মাধ্যমে নিবন্ধনের আওতায় এনে একটি সুশৃঙ্খল নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে।
৫. জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সাংবাদিকদের পেশাগত সমস্যা, নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষায় সময়োপযোগী ব্যবস্থা নিতে হবে।
৬. সরকারি বা বেসরকারি যেকোনো ব্যক্তি সাংবাদিকদের পেশাগত কাজে বাধা দিলে তা ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করে তাৎক্ষণিক আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।বক্তারা আরও বলেন, স্বাধীন গণমাধ্যম ছাড়া উন্নত, জবাবদিহিমূলক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা কল্পনা করা যায় না। সাংবাদিকদের অধিকার রক্ষা মানেই জনগণের তথ্য জানার অধিকার রক্ষা।মানববন্ধন শেষে সাংবাদিক নেতারা ঐক্যবদ্ধ কণ্ঠে ঘোষণা দেন— গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, সাংবাদিক নিরাপত্তা, ন্যায্য অধিকার ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় তাদের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসের এ আয়োজন শুধু একটি প্রতীকী কর্মসূচি ছিল না; এটি ছিল স্বাধীন সাংবাদিকতা, গণতন্ত্র, সত্য ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সাংবাদিক সমাজের ঐক্যবদ্ধ অঙ্গীকারের শক্তিশালী বহিঃপ্রকাশ।

