হাসান মামুন, পিরোজপুর অফিস: পিরোজপুর জেলা হাসপাতাল যেন এখন অনিয়ম, প্রশাসনিক দুর্বলতা ও সেবাহীনতার প্রতীক। চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও তাঁদের স্বজনদের অভিযোগ – সরকারি হাসপাতাল হয়েও এখানে দায়িত্বে গাফিলতি, অব্যবস্থাপনা ও স্বেচ্ছাচারিতা এখন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। ১৯৮৬ সালে মহকুমা থেকে জেলায় উন্নীত হওয়ার পর ৩১ শয্যা নিয়ে শুরু হয় হাসপাতালটির কার্যক্রম। পরে ১৯৯৭ সালে ৫০ শয্যার নতুন ভবন নির্মিত হয় এবং ২০০৫ সালে তা উন্নীত হয় ১০০ শয্যায়। ২০১৭ সালে হাসপাতালটি ২৫০ শয্যায় উন্নীত করার ঘোষণা দেওয়া হয়। কিন্তু শয্যা বাড়লেও সেবার মানে তেমন কোনো উন্নতি হয়নি বলে অভিযোগ রোগী ও স্থানীয়দের। এদিকে নতুন ভবনে লিফট ও বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকায় সেটি এখনো গণপূর্ত বিভাগের পক্ষ থেকে স্বাস্থ্য বিভাগে হস্তান্তর হয়নি। ফলে প্রত্যাশিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন জেলার প্রায় ১৬ লাখ মানুষ।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, হাসপাতালে রক্তসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। নথিতে পরীক্ষাগুলো চালু দেখানো হলেও বাস্তবে তা বন্ধ। এ বিষয়ে জানতে চাইলে আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. নিজাম উদ্দিন বলেন, “রিএজেন্টের ঘাটতির কারণে কিছু পরীক্ষা সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে। দন্ত বিভাগে গিয়ে দেখা যায়, চিকিৎসা কক্ষে রক্তমাখা যন্ত্রপাতি, অপরিষ্কার চেয়ার এবং দুর্গন্ধযুক্ত পরিবেশ। স্থানীয়দের অভিযোগ – একই যন্ত্রপাতি যথাযথভাবে জীবাণুমুক্ত না করেই ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, পরিচ্ছন্নতা রক্ষায় নিয়মিত নির্দেশনা দেওয়া হয়।দু’দিন আগে হাসপাতাল এলাকায় দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকলেও জেনারেটর চালু করা হয়নি। জরুরি বিভাগে চিকিৎসা দিতে হয় অন্ধকারে। সাংবাদিকদের মাধ্যমে বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পরপরই জেনারেটর চালুর নির্দেশ দেন আরএমও।
ভর্তি রোগীদের খাবার সরবরাহেও অনিয়মের রোগীদের অভিযোগ, নির্ধারিত তালিকা অনুযায়ী খাবার দেওয়া হয় না; যা দেওয়া হয় তা কম পরিমাণে ও নিম্নমানের। একাধিক রোগী জানান, সকালের নাশতায় দেওয়া হচ্ছে দুইটি ছোট পাউরুটি, একটি ডিম, সামান্য চিনি ও একটি ছোট চিনিচাপা কলা – যেখানে নিয়ম অনুযায়ী থাকা উচিত ৪ ইঞ্চি আকারের সবরি কলা। দুপুরে মাছ দেওয়ার কথা থাকলেও প্রায়ই দেওয়া হচ্ছে মুরগির মাংস, তাও নির্ধারিত ৬০ গ্রামের বদলে ৫০ গ্রামের কম টুকরা। হাসপাতাল সূত্র জানায়, ভর্তি রোগীদের জন্য সরকারিভাবে প্রতিদিন ১৭৫ টাকার তিন বেলা খাবার বরাদ্দ রয়েছে। দরপত্র অনুযায়ী সপ্তাহে পাঁচ দিন মাছ ও মাংস এবং দুই দিন ডিম ও মাছ দেওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে এর কোনোটিই মানা হচ্ছে না। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সর্বোচ্চ দরদাতা প্রতিষ্ঠান হিসেবে খাবার সরবরাহের দায়িত্ব পায় শেখ অ্যান্ড সন্স ট্রেডার্স। দরপত্রের মেয়াদ শেষ হলেও নতুন কোনো দরপত্র আহ্বান না করে একই ঠিকাদারই খাবার সরবরাহ করছে। রান্নার দায়িত্বে থাকা রাধুনী লাভনি আক্তার বলেন, আজকে মাছের পরিবর্তে মাংস দেওয়া হয়েছে, কারণ ঠিকাদার মাছ পাঠায়নি। বাজারে সবরি কলা না থাকায় চিনিচাপা কলা দেওয়া হয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) হাসপাতালটি পরিদর্শন করে খাবারের পরিমাণ কম দেওয়ার সত্যতা পেয়ে সংশ্লিষ্টদের সতর্ক করেছিল। কিন্তু এরপরও অনিয়মের ধারা থামেনি।
পিরোজপুরের সিভিল সার্জন ডা. মো. মতিউর রহমান বলেন, আমি কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালনে নিয়মিত সচেতন থাকার নির্দেশ দিয়েছি। খাবার সরবরাহসহ সার্বিক বিষয় মনিটরিংয়ের জন্য কমিটি আছে। আগামীকাল আমরা আরএমও ও ঠিকাদারের সঙ্গে মিলে পরিদর্শন করব। অনিয়ম পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সচেতন নাগরিকদের অভিযোগ – হাসপাতালের ব্যবস্থাপনায় গাফিলতি, প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপ ও দুর্নীতি দীর্ঘদিন ধরেই চলমান। প্রশাসনিক একাধিক নির্দেশনা এলেও বাস্তবায়নে অগ্রগতি খুবই সীমিত।

