বিশেষ প্রতিনিধি : ফ্যাসিস্ট সরকার শেখ হাসিনার পতনের যুগপৎ আন্দোলনে শরিক দলগুলোর মধ্যে ‘মতভিন্নতা থাকতে পারে কিন্তু কোনো বিভেদ নেই’ বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সোমবার সন্ধ্যায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় শরিক নেতাদের সম্মানে নৈশভোজের আগে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এই মন্তব্য করেন। প্রধানমন্ত্রীতারেক রহমান বলেন, ‘আমরা একসঙ্গে আছি, আমরা একসঙ্গে ছিলাম; ইনশাল্লাহ আমরা ভবিষ্যতেও একসঙ্গে থাকব। আমাদের মধ্যে ডিফেন্স অব অপিনিয়ন আলাদা হতে পারে কিন্তু ভুল বুঝাবুঝির কোনো কারণ আমাদের মধ্যে আছে বলে আমি মনে করি না। ৩১ দফার মাধ্যমে আমরা একটি জায়গায় একত্রিত হয়েছি; আমাদের উদ্দেশ্য এবং লক্ষ্য এক। তারেক রহমান আরও বলেন, ‘যেহেতু আমাদের উদ্দেশ্য এবং লক্ষ্য এক। আমাদের মত ভিন্ন হতে পারে যেমন: একটি দফা কীভাবে বাস্তবায়ন করব এ ব্যাপারে আপনার একটি মত থাকতে পারে, আমার একটি মত থাকতে পারে। এখানেই হয়তো কিছুটা ভিন্নতা থাকতে পারে। কিন্তু আমাদের মধ্যে কোনো বিভেদ নেই। ৩১ দফার আলোকে হোক কিংবা জুলাই সনদের আলোকে হোক আমরা দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাব। অতীতের আন্দোলনের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘একটু পেছনে নিয়ে যাই আমরা যখন আন্দোলন সংগ্রামে রাজপথে ছিলাম। আজকে অনেকেই দাবি করে কারো নাম আমি উল্লেখ করতে চাই না যাদেরকে একটি শব্দ ‘গুপ্ত’ ব্যবহার করলেই সাধারণ মানুষও তাদেরকে চিনে। এদেরকে কিন্তু ওই সময়ে আমরা অনেক খুঁজেছি তাদেরকে আমরা পাইনি, আমি পাইনি দূরে থেকে। আপনারা কি কেউ পেয়েছিলেন রাজপথে তাদেরকে? তাদেরকে কিন্তু রাজপথে আমরা দেখিনি। বিভিন্ন সময়ে তাদেরকে দেখেছি যারা পালিয়ে গেছে এই দেশ থেকে তাদের সঙ্গে। শেষের দিকে কিছু কিছু জায়গায় তাদেরকে দেখেছি। কিন্তু ১৭ বছর বিভিন্ন জায়গায় আমরা তাদেরকে দেখিনি। সেজন্যই দেশের মানুষ আমাদের ওপরেই আস্থা রেখেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘দেশের মানুষের আস্থা ধরে রাখার জন্য আমাদেরকে যেকোনো মূল্যে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে, দেশের মানুষের আস্থা ধরে রাখার জন্য আমরা সবাই একসঙ্গে কাজ করব। কারণ জনগণের প্রত্যাশা আমাদের কাছে। জনগণ প্রত্যাশা নিয়ে আমাদেরকে দায়িত্ব দিয়েছে। আসুন আগে আমরা দায়িত্বটা পালন করি। তারপর আমরা নিজেদেরকে নিয়ে ভাবি।
সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় যুমনার অনুষ্ঠানস্থলে এসে প্রধানমন্ত্রী শরিক দলের নেতাদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন এবং তাদের খোঁজ-খবর নেন।
কুশল বিনিয়ম পর্বের পর নেতাদের নিয়ে রাতে খাবার টেবিলে বসেন প্রধানমন্ত্রী। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন বিএনপি মহাসচিব স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান তার বক্তব্যের শুরুতে বলেন, ‘অনেকদিন পরে আপনাদের সঙ্গে আজ দেখা হয়েছে। কথাটা বললাম এজন্য যে, স্বাভাবিকভাবেই আমরা একসঙ্গে আন্দোলন সংগ্রাম করেছি। আমরা অত্যাচারিত হয়েছি, নির্যাতিত হয়েছি। আমরা বাংলাদেশের মানুষের রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সফল হয়েছি এবং আমরা সাধারণ মানুষের কাছে গিয়েছিলাম তাদের ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করার যে দাবি নিয়ে; সেই অধিকার আদায়ে আমরা বিজয় অর্জন করেছি। বাংলাদেশের মানুষ তাদের রায় দিয়ে দেশ পরিচালনা করার দায়িত্ব দিয়েছে। তিনি আরও বলেন, ‘অনেকগুলো রাজনৈতিক দল একসঙ্গে বসে আমরা ৩১ দফা উপস্থাপন করেছিলাম বাংলাদেশের মানুষের সামনে। আপনাদের নিশ্চয়ই এটাও স্মরণ আছে যে ৩১ দফা অর্থাৎ রাষ্ট্র মেরামতের যে দফাগুলো আমরা উপস্থাপন করেছিলাম সেগুলোকে আমরা সংস্কারই বলি, সেগুলোকে আমরা রাষ্ট্র মেরামতের দফা বলেই উপস্থাপন করেছিলাম। তখন বাংলাদেশের অন্য অনেকগুলো রাজনৈতিক দল, বিভিন্ন ব্যক্তি বিভিন্ন পর্যায়ে যারা পরবর্তীতে আমরা দেখেছি যে সংস্কার নিয়ে অনেক বড় বড় কথা বলেছেন এই মানুষগুলোকে বা এই রাজনৈতিক দলগুলোকে তখন সংস্কারের ‘স’ বলতে দেখিনি। কিন্তু আজকে আমরা এই প্যান্ডেলের নিচে যারা বসে আছি একত্রে আমরা কিন্তু তখন স্বৈরাচারের চোখ রাঙানিকে উপেক্ষা করে রাষ্ট্র সংস্কারের দফাগুলো দিয়েছিলাম। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘আমি মনে করি, নির্বাচনে জনগণ ৩১ দফার পক্ষে রায় দিয়েছে। এখন এই ৩১ দফা শুধু আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো নয় বরং বাংলাদেশের জনগণের ৩১ দফা হয়ে গেছে। ১২ তারিখের নির্বাচনে আমরা একসঙ্গে কাজ করেছি এবং আমরা সফল হয়েছি। তিনি আরও বলেন, ‘আপনারা নিশ্চয়ই দেখেছেন ৫ আগস্ট স্বৈরাচার বিতাড়িত হয়েছিল। স্বৈরাচার বিতাড়িত হওয়ার পরে একটি গুপ্তবাহিনী পাচঁ তারিখের পরে ধীরে ধীরে আত্মপ্রকাশ করেছিল। আপনাদের পরিষ্কার মনে আছে যে তারা ১২ তারিখের নির্বাচনে এবং নির্বাচনের আগে কি স্বৈরাচারী কায়দায় ডিজিটাল ওয়েতে তারা কীভাবে তাদের কাজগুলো চালিয়েছিল? কীভাবে তারা বাংলাদেশের জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছিল। তবে এটা ঐতিহাসিকভাবে সত্য বাংলাদেশের জনগণ যখনই স্বাধীনভাবে তাদের মতামত দেওয়ার সুযোগ পেয়েছে তারা সব সময় দেশের পক্ষে, জনগণের পক্ষে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে কখনো ভুল করেনি এবং ঠিক ১২ তারিখের নির্বাচনেও তারা সেটিই করেছে।অন্তবর্তীকালৗন সরকারের এক উপদেষ্টার কথা’অন্তবর্তীকালীন সরকারের এক উপদেষ্টার কথা উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি সংগত কারণেই নামটি উচ্চারণ করতে চাই। কয়েকদিন আগে আমার সঙ্গে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের একনজ উপদেষ্টার সাক্ষাৎ হয়েছিল। কথা প্রসঙ্গে উনি বলছিলেন যে উনারা ১৮ মাসের মতো দেশ পরিচালনা করেছেন; এই ১৮ মাস উনারা কতটা অসহায় অবস্থায় ছিলেন। উনি (উপদেষ্টা) বলছেন, সরকারে ৬০ শতাংশের ওপরে সেই গুপ্ত বাহিনীর ইনফ্লুয়েন্স ছিল।’
তিনি আরও বলেন, আমরা দেখেছি নির্বাচনের পরে এই গুপ্তবাহিনীকে দিশাহারার মত বক্তব্য রাখতে এবং এখনো বিভিন্ন রকম বক্তব্য রাখছে তারা। আমরা পত্রপত্রিকাতে দেখছি, সোশ্যাল মিডিয়াতে দেখছি। সেই ব্যক্তির (উপদেষ্টার) বক্তব্য হচ্ছে যে এরা দিশেহারা হয়ে গেছে ১৮ মাস তারা এমনভাবে পুরো প্রক্রিয়াটাকে ব্যবহার করেছে তাদের পক্ষে। কিন্তু ১২ তারিখে যখন জনগণ তাদের রায় প্রদান করেছে তারপর থেকে তাদের মাথা খারাপ হয়ে গেছে।ফ্যাসিস্ট সরকারের ১৬/১৭ বছরের রেখে যাওয়া বিধ্বস্ত অর্থনীতি, বিধ্বস্ত জ্বালানি বা বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, শিক্ষা ব্যবস্থা, যোগাযোগ ব্যবস্থা, স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন এবং এসব সংকট মোকাবিলার কথাও বলেন প্রধানমন্ত্রী।প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা এতোদিন একসঙ্গে ছিলাম। কেন আমরা সরিয়ে দেব। আমরা একসঙ্গেই থাকব। চলতে গেলে এদিক-ওদিক হতেই পারে । এত সমস্যা ২০ কোটি মানুষের দেশে। আপনি দেখেন এই ঢাকা শহর এখন পরিষ্কার করতেই সমস্য। যেদিকে তাকাবেন ময়লা। কেউ একজন বলেছেন এটা কি ফেয়ারওয়েল ডিনার কিনা? কেন ফেয়ারওয়েল কেন হবে। ফেয়ারওয়েল ডিনার যদি দিতে হয় গুপ্ত-সুপ্তদের বলতে পারি, স্বৈরাচারকে বলতে পারি। কিন্তু আমরা যারা ছিলাম। আমরা ইনশাল্লাহ একসঙ্গে থাকব। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘অনেকদিন বসার সুযোগ হয়নি সেজন্য আজ এই আয়োজন করেছি। আমি জানি, মুরুবিরা যা বলেছেন তার সঙ্গে আমি মোটেও দ্বিমত করব না। উনাদের মনে এই কষ্টের কথাগুলো আছে সেগুলো আমি জানি; স্বাভাবিক। বয়সে উনারা আমার থেকে বড় আমি ছোট ভাই হিসেবে বড় ভাইদের সকল বিষয়গুলি মেনে নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করছি। আমি শুধু এতটুকুই অনুরোধ করব, একটু আমাদের সবাইকে ধৈর্য ধরতে হবে। কারণ খুব সম্ভবত মান্না (মাহমুদুর রহমান মান্না) ভাই উনার বক্তব্যে বলেছেন যে জনগণের প্রত্যাশা অনেক। আসুন আমরা সকলে মিলে চেষ্টা জনগণের প্রত্যাশা আগে এড্রেস করি। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীকে শুভেচ্ছা জানিয়ে জাতৗয় পার্টির (কাজী জাফর) চেয়ারম্যান মোস্তফা জামাল হায়দার, নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সম্পাদক সাইফুল হক, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মুফতি মহিউদ্দিন ইকরাম বক্তব্য রাখেন। শরিক নেতাদের সঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহ উদ্দিন আহমদ, সেলিমা রহমান, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, সহসভাপতি বরকত উল্লাহ বুলু, মোহাম্মদ শাহজাহান, আবদুল আউয়াল মিন্টু প্রমুখ নেতারা ছিলেন। এ ছাড়া একই ডিনার টেবিলে প্রধানমন্ত্রীকে ঘিরে বসেছিলেন নাগরিক ঐক্যের মাহবুবুর রহমান মান্না, গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হক, জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর) মোস্তফা জামাল হায়দার, বিজেপির আন্দালিব রহমান পার্থ, বিএনপির মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, গণফোরামের সুব্রত চৌধুরী, ভাসানী জনশক্তি পার্টির শেখ রফিকুল ইসলাম বাবলু।

