আওরঙ্গজেব কামাল : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই দেশের রাজনৈতিক মাঠে বাড়ছে উত্তাপ, উত্তেজনা ও অনিশ্চয়তা। নির্বাচনকে ঘিরে একদিকে যেখানে গণতান্ত্রিক উৎসবের আবহ তৈরির কথা, সেখানে বাস্তব চিত্র ক্রমেই ভিন্ন রূপ নিচ্ছে। যদিও দেশের অনেক নির্বাচনীয় এলাকায় চলছে উৎসবের আমেজ। নির্বাচনী প্রচারণার ব্যস্ততা, লিফলেট-ব্যানার, মিছিল ও জনসংযোগের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে বাড়ছে সহিংসতা, সংঘর্ষ ও নিরাপত্তাহীনতা। ফলে সাধারণ মানুষের মনে জন্ম নিচ্ছে প্রশ্ন, উদ্বেগ ও গভীর উৎকণ্ঠা—এই নির্বাচন আদৌ কতটা অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হতে পারবে? নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ নতুন কিছু নয়। কারন এটা দেশের যেন নিয়মে পরিনত হয়েছে। যে দল ভোটে হারবে সে দল নির্বাচন কমিশনের দিকে আঙ্গুল তুলবে, বলবে নির্বাচন সুষ্ঠ হয়নি। কিন্তু এবারের নির্বাচনে সেই অভিযোগের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রাণঘাতী সহিংসতা। আচরণবিধি অমান্য করে শোডাউন, প্রভাব বিস্তার, ক্ষমতার প্রদর্শন এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ভয় দেখানোর সংস্কৃতি আবারও দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ছুরিকাঘাত, হামলা, অপহরণ ও সংঘর্ষের মতো ভয়াবহ ঘটনা—যা একটি নির্বাচনী পরিবেশের জন্য অত্যন্ত অশনিসংকেত। ময়মনসিংহের ধোবাউড়া উপজেলার এরশাদ বাজারে নির্বাচনী অফিস উদ্বোধনকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে ছুরিকাঘাতে নিহত হন নজরুল ইসলাম (৪০)। তিনি ময়মনসিংহ-১ (হালুয়াঘাট–ধোবাউড়া) আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী সালমান ওমর রুবেলের কর্মী বলে জানা গেছে। একটি নির্বাচনী কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে প্রাণহানির ঘটনা শুধু ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়; এটি পুরো নির্বাচন ব্যবস্থার নিরাপত্তা ও গ্রহণযোগ্যতার ওপর সরাসরি আঘাত। এর রেশ কাটতে না কাটতেই গাইবান্ধা-৩ (পলাশবাড়ী–সাদুল্লাহপুর) আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য প্রার্থী আজিজার রহমানকে অজ্ঞান অবস্থায় রংপুরের মডার্ন মোড় এলাকা থেকে উদ্ধার করে পুলিশ। এই ঘটনা নির্বাচনী মাঠে প্রার্থীদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। নির্বাচন যদি প্রার্থী ও কর্মীদের জীবনঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তবে সাধারণ ভোটারের নিরাপত্তা ও অংশগ্রহণ কতটা নিশ্চিত—সে প্রশ্ন অনিবার্যভাবেই উঠে আসে। এ ছাড়া চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার বদুরপাড়া এলাকায় জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আহত হাসনাত আবদুল্লাহর ওপর সশস্ত্র হামলা, বরগুনার পাথরঘাটায় জামায়াতে ইসলামী ও বিএনপির কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ, সংসদ সদস্য প্রার্থী হাদী হত্যাকাণ্ড—সব মিলিয়ে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে একের পর এক সহিংস ঘটনা দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও অস্থির করে তুলছে। এই ঘটনাগুলো স্পষ্ট করে দিচ্ছে, সহিংসতা আর শুধু তৃণমূল পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নেই; তা এখন প্রার্থী ও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নিরাপত্তাকেও হুমকির মুখে ফেলছে। এটি কেবল আইনশৃঙ্খলার ব্যর্থতা নয়, বরং রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক কাঠামোর ওপর একটি গভীর সংকেত। নির্বাচন কমিশন বারবার অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন আয়োজনের আশ্বাস দিয়ে আসছে। তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা সেই আশ্বাসকে বারবার প্রশ্নবিদ্ধ করছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দুর্বলতা, অপরাধীদের দ্রুত বিচারের আওতায় না আনা এবং রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে দায়মুক্তির সংস্কৃতি সহিংসতাকে আরও উৎসাহিত করছে। এদিকে জোট রাজনীতির অনিশ্চয়তাও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। কখন কে কোন জোটে যাচ্ছে, আবার কখন জোট ভেঙে বেরিয়ে আসছে—এসব বিষয়ে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে। রাজনৈতিক স্বচ্ছতার এই অভাব নির্বাচনী বিশৃঙ্খলাকে আরও ঘনীভূত করছে।বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদের বক্তব্য অনুযায়ী, একটি পক্ষ নির্বাচন প্রতিহত করতে নানামুখী কৌশল নিচ্ছে। কিন্তু নির্বাচন বানচালের যেকোনো চেষ্টা দেশের গণতন্ত্রের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। নির্বাচন প্রতিহত নয়, বরং নির্বাচনকে নিরাপদ, গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক করাই হওয়া উচিত সবার লক্ষ্য। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেবল ক্ষমতা হস্তান্তরের একটি প্রক্রিয়া নয়; এটি দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। এই নির্বাচন যদি ভয়, সহিংসতা ও অনাস্থার পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়, তবে তার নেতিবাচক প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে রাজনীতি, রাষ্ট্র পরিচালনা ও নাগরিক অধিকারকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। এখনো সময় আছে। নির্বাচন কমিশনকে আরও কঠোর, সক্রিয় ও দৃঢ় ভূমিকা নিতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে পেশাদার ও নিরপেক্ষ দায়িত্ব পালন করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোকেও সহিংসতার পথ পরিহার করে গণতান্ত্রিক আচরণ নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায়, নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসবে, ততই প্রশ্ন বাড়বে—আর সেই প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর দিতে ব্যর্থ হলে সবচেয়ে বড় ক্ষতির মুখে পড়বে বাংলাদেশের গণতন্ত্র। আশা করা যায়, সব সংকট ও অস্থিরতা পেরিয়ে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য, যার মধ্য দিয়ে গড়ে উঠবে একটি জবাবদিহিমূলক সরকার এবং নিশ্চিত হবে জনগণের বাকস্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক অধিকার।
লেখক ও গবেষক:
আওরঙ্গজেব কামাল
সভাপতি
ঢাকা প্রেসক্লাব ও আন্তর্জাতিক প্রেস ক্লাব

