আওরঙ্গজেব কামাল : রাজধানী ঢাকার সকালটা আজ ছিল প্রচন্ড শীত ও কুয়াশা। কিন্ত ভালবাসা এ সব মানে না। অনেকে জানাজায় শরীক হতে পারেনি। অনেকে প্রীয় নেত্রীকে শেষ বারের মত একবার দেখতে পারেনি। তাই সেই আবেগ নিয়ে প্রচন্ড শীত ও কুয়াশা উপেক্ষা তাই এসেছে প্রীয় নেত্রীকে শ্রদ্ধা জানাতে। এখানে নেতা কর্মী শুধু নয় সর্ব শ্রেনী পেশার মানুষ এসেছে। কেউ পবিত্র কোরআন তেলোয়াত,কেউ কবর জিয়ারাত করছে ও কেউ শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন। এ যেন অন্যরকম দৃশ্য। এ থেকে প্রমানিত হয় সাবেক তিনবারের প্রধান মন্ত্রী ছিলেন গণতন্ত্রের মানষ কন্যা বা গণতন্ত্রের মাতা। সরেজমিনে যেয়ে দেখাযায়, ঘন কুয়াশায় ঢেকে ছিল চারপাশ, আকাশ আর মাটির মাঝখানে যেন ঝুলে ছিল এক অদৃশ্য শোক। জিয়া উদ্যানের ভেতরে ঢুকতেই মনে হচ্ছিল, প্রকৃতিও আজ কথা বলতে চায় না—নীরবতায় নিজের ভাষায় শোক প্রকাশ করছে। সেই কুয়াশার চাদর ভেদ করেই এক জায়গায় ছিল মানুষের চলাচল, আবেগ আর দীর্ঘশ্বাস—বেগম খালেদা জিয়ার সমাধিস্থল। চার দিন পেরিয়ে গেলেও মানুষের ঢল কমেনি। বরং সময় যত এগোচ্ছে, স্মৃতির টান যেন ততই গভীর হচ্ছে। কুয়াশা উপেক্ষা করে সকাল থেকেই মানুষ আসছেন—কারও হাতে ফুল, কারও চোখে জল, আবার কেউ নিঃশব্দ প্রার্থনা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন প্রিয় নেত্রীর কবরের পাশে। আজ সমাধিস্থলে দেখা যায়, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও দেশের নানা জেলা ও উপজেলা থেকে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা দলবদ্ধভাবে মানুষ আসছেন। তাঁদের সঙ্গে রয়েছেন সাধারণ মানুষ, শিক্ষার্থী, প্রবীণ, তরুণ—ভিন্ন পরিচয় হলেও আবেগ এক। সবাই ফুল দিয়ে, নীরবে দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রকে। ফুলে ফুলে ঢেকে যাচ্ছে কবরের বেদি। কেউ মাথা নিচু করে দীর্ঘ সময় নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকছেন, কেউ চোখ বন্ধ করে দোয়ায় মগ্ন। পাশের মাইকে ভেসে আসছে পবিত্র কোরআনের তিলাওয়াত। কুয়াশার ভেতর দিয়ে সেই তিলাওয়াত যেন হৃদয়ের গভীরে পৌঁছে পরিবেশকে আরও ভারী করে তুলছে।সমাধিস্থলের পাশে স্থাপিত ছোট একটি মঞ্চে মাদরাসার ছাত্র ও শিক্ষকরা ধারাবাহিকভাবে কোরআন তিলাওয়াত করছেন। বাতাসে ভেসে থাকা আয়াতের সুর পুরো এলাকাকে ঘিরে ফেলেছে এক অদ্ভুত প্রশান্ত বিষাদে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী সন্মিলিত নাগরিক দলের আব্দুল আজিজ বলেন,“খালেদা জিয়া আমাদের কাছে শুধু একজন রাজনীতিবিদ ছিলেন না। তিনি ছিলেন বিশ্বাসের নাম, সাহসের নাম। তাঁর আদর্শেই আমরা রাজনীতিতে এসেছি। তাই মন টানে বারবার এই কবরের কাছে। আশুলিয়া থেকে আসা ভুমীহীন নেতা মোঃ আজাহার বলেন, “তিনি নিজের জন্য কিছু চাননি। সারাজীবন দেশ আর মানুষের কথাই বলেছেন। আজ এখানে এসে মনে হচ্ছে, অন্তত শ্রদ্ধা জানিয়ে আমরা আমাদের দায়টা সামান্য হলেও পালন করছি। এক তরুণ কর্মী দীর্ঘ সময় কবরের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন নীরবে। কিছুক্ষণ পর তিনি বলেন,“খালেদা জিয়ার চলে যাওয়া এখনো মেনে নিতে পারছি না। ছোটবেলা থেকেই তাঁকে দেখে বড় হয়েছি, তাঁর বক্তব্য শুনেছি, মিছিলে হেঁটেছি। আজ মনে হচ্ছে—আমাদের একটা শক্ত ছায়া নেই হয়ে গেছে।বিএনপির পাশাপাশি বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরাও সমাধিস্থলে ফুলেল শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন। কোথাও কোনো স্লোগান নেই, নেই উত্তেজনা—শুধু নীরবতা, শুধু স্মৃতি। আজ কুয়াশায় ঢাকা এই শহরে খালেদা জিয়ার কবর আর শুধু একটি সমাধি নয়। এটি হয়ে উঠেছে ভালোবাসা, রাজনীতি আর ইতিহাসের এক নীরব মিলনস্থল। এখানে এসে মানুষ কথা না বলেও অনেক কিছু বলে ফেলে—চোখের জলে, নিঃশব্দ দোয়ায়, দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকার মধ্য দিয়ে। এই কবরের পাশে দাঁড়িয়ে কেউ হারানো নেত্রীকে খোঁজে, কেউ নিজের বিশ্বাসকে নতুন করে শক্ত করে। কেউ সন্তানের হাত ধরে দেখিয়ে দেয় বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। কুয়াশা যত ঘনই হোক, মানুষের হৃদয়ের এই টানকে ঢেকে রাখতে পারে না। দিন যায়, সময় এগোয়। কিন্তু এই ঠিকানায় মানুষের ফিরে আসা থামে না। বেগম খালেদা জিয়ার সমাধিস্থল নীরব সাক্ষী হয়ে থাকবে কোটি মানুষের ভালোবাসা, আবেগ আর শেষ শ্রদ্ধার। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলনের আপসহীন নেত্রী ও তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ৮০ বছর বয়সে গত ৩০ ডিসেম্বর ভোরে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন।

