আওরঙ্গজেব কামালঃ দেশ যখন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করছে, ঠিক সেই মুহূর্তে রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক সংঘাত যেন আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। এর সাম্প্রতিক উদাহরণ—পাবনায় বিএনপি–জামায়াতের অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষ, যেখানে এমপি প্রার্থীসহ কমপক্ষে অর্ধশতাধিক মানুষ আহত হয়েছে। নির্বাচন ঘনিয়ে আসার এই সময়ের এমন ঘটনা নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক, এবং প্রশ্ন তোলে—এটা কি রাজনৈতিক অস্থিরতার নতুন বার্তা নয়?আজ দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ক্ষমতার লড়াই যেন একমাত্র লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদল নির্বাচনে অংশ নিয়ে যেকোনোভাবে ক্ষমতায় যাওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছে; অন্যদল আবার নির্বাচন প্রতিহত করার কর্মসূচি নিয়ে মাঠে। ফলে এই টানাপোড়েনের চরম চাপ এসে পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপর—যারা এই রাষ্ট্রের প্রকৃত মালিক। এটা কিসের আলামত। বর্তমানে ক্ষমতায় যাওয়ার প্রতিযোগিতা রানৈতিক দলগুলির যে কোনো মূল্যেই হোক, এমন মনোভাব এখন রাজনৈতিক অঙ্গনে স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। একপক্ষ নির্বাচনে অংশ নিয়ে ক্ষমতায় যেতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ; অন্যপক্ষ আবার নির্বাচন প্রতিহত করার বিভিন্ন কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে। এই টানাপোড়েনে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে সাধারণ জনগণই। স্থানীয় পর্যায়ে অভিযোগ উঠেছে—কোথাও দখলবাজী, কোথাও চাঁদাবাজী, আবার কোথাও ধর্মীয় আবেগকে ব্যবহার করে রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চলছে। একইসঙ্গে দেখা যাচ্ছে, ঐতিহাসিক ঘটনাকে রাজনৈতিক ফায়দা তুলতে ব্যবহারের অভিযোগও উঠেছে। বিশেষ করে ‘জুলাই শহীদ’ এবং ‘জুলাই আহতদের’ স্মৃতি নিয়ে রাজনৈতিক পক্ষগুলোর মধ্যে দোষারোপের পালা থামছেই না। কিন্তু আহতদের খোঁজ-খবর নেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের তৎপরতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে জনমহলে। দেশ যখন গণতান্ত্রিক যাত্রাকে সুসংহত করার পথে এগিয়ে যাওয়ার কথা, তখন রাজনৈতিক অঙ্গনে যেন উল্টো দৃশ্যপট। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক দলগুলোর আচরণ আজ জনগণের বিবেচনায় উদ্বেগজনক। একদিকে ক্ষমতায় যাওয়ার অদম্য লোভ, অন্যদিকে নির্বাচন প্রতিহত করে রাজনৈতিক সুবিধা আদায়ের চেষ্টা—এই দুই ধারা মিলেই জাতিকে এক অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। রাজনৈতিক দলগুলো এখন এতটাই মুখোমুখি অবস্থানে যে, দেশের সাধারণ মানুষের অবস্থা তাদের বিবেচনায় আসছে না বললেই চলে। বর্তমান পরিস্থিতি যেন এক অদ্ভুত খেলার মতো—ফাঁকা মাঠে গোল দেওয়ার প্রতিযোগিতা চলছে, কিন্তু নিয়ম ভাঙার পরিমাণ এত বেশি যে বেশিরভাগই লাল কার্ড পাওয়ার যোগ্য। এখন প্রশ্ন—এই লাল কার্ড দেখাবে কে? রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কি যথেষ্ট শক্তিশালী? নাকি রাজনৈতিক সঙ্কট এতটাই ঘনীভূত যে কোনো রেফারির ভূমিকাই কার্যকর নয়? সাধারণ মানুষ—এই খেলায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্তর মধ্যে পড়েছে। যে রাজনীতির মূল চালিকা শক্তি হওয়া উচিত জনগণ, তারা আজ সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে। গণপরিবহনে প্রতিনিয়ত অগ্নিসংযোগ, বস্তি ও আবাসিক ভবনে রহস্যজনক আগুন—এই ধারাবাহিকতা শুধুই দুর্ঘটনা নয়। এর মধ্যে নাশকতার গন্ধ আছে কি না, তা তদন্তের বিষয়; তবে ভয় ও অনিশ্চয়তা যে সাধারণ মানুষের জীবনে গভীরভাবে ঢুকে গেছে, তা অনস্বীকার্য। মানুষ আজ রাস্তায় বের হতে ভয় পাচ্ছে, রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেছে অনেকের। যে নির্বাচন তাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে বলে কথা, সেটিই এখন তাদের কাছে এক আতঙ্কের আরেক নাম। দায়িত্বহীনতার বোঝা আর বহন করা সম্ভব নয় এটা সুশিল সমাজের মতামত।রাজনৈতিক দলগুলো যদি ক্ষমতার লড়াই ভুলে জনগণের স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে না শেখে, তবে গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সাময়িক লাভের জন্য দেশকে অস্থিরতার দিকে ঠেলে দিলে তার মূল্য দিতে হবে পুরো জাতিকেই—এটি দলগুলোকে স্মরণ রাখতে হবে। নির্বাচনের আগে সহিংস এই অস্থিরতাকে রাজনৈতিক সঙ্কটের বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তাঁদের মতে, জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে সুষ্ঠু নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণে পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হচ্ছে। এর কারন কি ? এটা খুজে বের করতে হবে অন্তবর্তীন সরকার কে। তা না হলে এর দায়দায়ীত্ব সরকারকে নিতে হবে। একদিকে রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব রয়েছে ঐকমত্যে আসার, অন্যদিকে যেহেতু সরকার দায়িত্ব নিয়েছিল একটি গণতান্ত্রিক উপায়ে ঐকমত্য সৃষ্টির, তাই ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার কাজটি সরকারকেই দায়িত্ব। আমার মতে সম্মিলিত দায়িত্ববোধ ছাড়া গণতন্ত্র টিকে থাকতে পারে না। এখনই সময় সকল পক্ষের নিজেদের অবস্থান পর্যালোচনা করার। সংঘাত নয়, সংলাপ; ধ্বংস নয়, সমাধান—এই পথেই দেশের প্রতি সত্যিকারের দায়িত্বশীলতা প্রমাণ পাবে। জনগণের প্রশ্ন এখনও প্রতিধ্বনিত হচ্ছে—“লাল কার্ড দেখাবে কে?” এই প্রশ্নের উত্তর শুধু প্রতিষ্ঠানের কাছে নয়, রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছেও বিরাজমান। দিনশেষে সাধারণ মানুষ শুধু নিরাপত্তা ও শান্তি চায়। তারা চায়—রাজনৈতিক দলগুলো সংঘাত নয়, আলোচনার মাধ্যমে সমাধানে পৌঁছাক। জনগণের ভাষা তাদেরকে বুঝতে হবে। তা না হলে আবাও অশুভ সমস্যার মধ্যে ধাপিত হতে পারে দেশ। গণতন্ত্র টিকে থাকতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক আস্থা, সহনশীলতা ও সংলাপ জরুরি। ক্ষমতার প্রতিযোগিতা থাকবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সে প্রতিযোগিতা যেন রাষ্ট্র ও জনগণের ক্ষতির দিকে না যায়, সেটাই আসল চ্যালেঞ্জ।রাজনৈতিক নেতৃত্বকে জনগণের বার্তা বুঝতে হবে—কারণ বারবার সহিংসতা ঝরিয়ে ক্ষমতা অর্জনের লড়াই জনগণ আর দেখতে চায় না।
লেখক ও গবেষকঃ
আওরঙ্গজেব কামাল
সভাপতি
আন্তর্জাতিক প্রেস ক্লাব ও
ঢাকা প্রেস ক্লাব

